☆ কুড়মি ও কুড়মালি ভাষা ☆
সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মা ধরিত্রীর বুকে ছো,ঝুমুর,করম, টুসু, বাঁদনা/সঁহরই, নাটুয়ার দেশে জন্ম নেওয়া শাল,পিয়াল, মহুয়া, পলাশ, শিমুল, কেন্দ,ভেলা,ঢেলার আলয়ে আশ্রিত পাখিদের কলরবের ,স্বাপদ সঙ্কুদ পশুদের বিচরণ জঙ্গলাকীর্ণ তরাই উতরাই শিখর ছোটনাগপুরের ভূমিতে শষ্য শ্যামলী মায়ের বুকে ধাবিত আবহমানকাল হইতে আপন বেগে কুলকুল সুরে ঝুমুরের ছন্দে নিজ আস্তানায় ছুটে চলেছে কাঁসাই, শিলাই,সুবরনখা,গুয়াই ,দামোদর,কুমারী, হিজরী।
জন্ম থেকে নিজ আস্তানায় ছুটে চলতে আসা যে মা আমাদের সুরেলা ছন্দে ভাব বিনিময়ের মধ্যে মধুর সম্পর্ক গড়তে পারিবারিক গিঁটে নিমিলীত করে মানব বন্ধনের সুসম্পর্ক তৈরি করে সুমহান সভ্যতায় দিকে দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।সেই মা আর কেউ নয় আমাদের পরমা ধণ্যা সুরেলা কাঁকুরে মেঠো মাটির সহ্যশিলা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সম " কুড়মালি মা "।সেই মা আজ আমাদের জরাজীর্ণ, বঞ্চিত,অবহেলিত, হয়েও উন্নত শীরে গৌরবান্বিত হয়ে নিজ গুনে নিজের মহিমার নিজস্ব অফুরন্ত সম্পদ আপন করে রেখেছে।যে সম্পদের দানে মাতৃ সম আরো মায়ের জন্ম দিয়ে সেই মাকে বিশ্ব আসনে গৌরম্বাভিত করেছে।গৌরবান্বিত সেই মায়েরা প্রকৃত মায়ের পরিচয় নাম নেওয়া তো দুরের কথা স্মরণ করার কথাও হিতে বাধেনা।তবুও আমাদের কুড়মালি মা কোনদিন আক্ষেপ করেননি।সহ্যশিলা মা অন্নপূর্ণা ঈশ্বরি পাটনী মাতৃ স্নেহ কথন " আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে ভাতে " কথাটির মতো সকলকেই আপন করে নিয়েছে।বিলিতি ভাষাকে আপন করতে মাতৃভাষাকে অবহেলা করতে গিয়ে মাতৃভাষা কতটা আপন হতে পারে তা অনুশোচনা করে মাইকেল মধুসূদন বলে গেছেন -
নিজাগারে ছিল মোর অমূল্য রতন
অগণ্য,তা সবে আমি অবহেলা করি,
অর্থ লোভে দেশে দেশে করিনু ভ্রমণ,
ধন্য ভূমির প্রকৃতির পূজারীরা আপন করে রেখেছে প্রকৃতির দান সৌন্দর্যমণ্ডিত নিজ সৃষ্ট সম্পদকে। তাই তারা কখনো সমবেত ভাবে নিজ সৌন্দর্যের মহিমায় আবেগ কন্ঠে ঝুমুর তালে গেয়ে উঠে নিজ বাক ছন্দে -
মানভূম কেইসন সুনদর গউ,
আউআ দেখা ভাই
মানভুম কেইসন সুন্দর।
,কাঁসাই, শিলাই,সুবন্নখা নাচই কুদই আঁকা বাঁকা।
কুমারি গুআই দামুদর গো।
আবার ক্ষনিকের ভবে মানব জীবনের সুখ দুঃখ ভালোবাসার ভবের লীলাতরীতে বিরহের ছন্দে গেয়ে উঠে -
সুবন্নখা নদিঞ
সনা পাইঅ যদি,
বিছিবিনি গো নদি কিনারাঞ
জিনগানি গো হামে দেবউ বিতাই ।আমাদের এই অরন্য জঙ্গলে ঘেরা মানভূমের কঠিন মাটির কঠিন মানুষের সহজ সরল জীবনের " রুখা মাটির ভুখা সুখা মানুষ " এই থিমসঙ্ হিসেবে তমকা পাওয়া উপহার নিয়েই বহুল প্রচলিত।যা কিনা অলঙ্কার স্বরূপ এখনো এই নামে পরিচিত।
তবুও রুখা সুখার পবিত্র ভূমিতে সুপ্রাচীন কালে জৈন,বৌদ্ধ ধর্মের আগমন, বিশ্ববরেণ্য মহান সম্রাট অশোকের জীর্ণ পথে গমনাগমন। মধ্য যুগে শ্রীচৈতন্য তো বলেই গেছেন " রাঢ়ী সুরে রাঢ়ী বলে ,রাঢ়ী আখরে কীর্তন করিব " । মুঘলেতে মান সিং আসিয়া নিজ নামাঙ্কিত করিয়া খোদিত করেছিলেন ভূখন্ডের নাম।আধুনিকে রুখা মাটির ভালোবাসার তরে মাইকেল নিজস্ব ছন্দে লিখে গেছেন-
পাষাণ ময় যে দেশ,সে দেশে পড়িলে
বীজকুল,শষ্য তথা কখন কি ফলে?
কিন্তু কত মহানন্দ তুমি মোরে দিলে,
হে পুরুল্যে;দেখাইয়া ভকত মন্ডলে!
দেশ মাতার গান্ধী নেতাজি কথা জানায় আছে।তাইতো এই সুপ্রাচীন ইতিহাস মুরছিত,এই জন্য মুরছিত ইতিহাসকে বাহন করিতে না পারিয়া বহন করিয়া শ্রুতি হিসেবেই কন্ঠস্তীত রয়ে গেছে। যে টুকু ইতিহাস রয়ে গেছে সেটা পরিক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার ফলাফল ছাড়া আর কিছু নেই।
অতিতের স্মৃতি ভূলে গিয়ে আজ আমাদের কুড়মালি মা " রাজকীয়" মহিমায় হৃত গৌরব ফিরে পেলেন ।এই দিনটি আজ স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এবং আজ আনন্দক্ষণে মাননীয়াকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে রাজকীয় মহিমায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন।
মম হৃদয় হর্ষ আঁখি ছলে,
আজ কুড়মালি মা কহে বুলি,
প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ আমি,
থাকিব সদা সকলের স্বনে।
সুসোভিত মুকুট পলক,
পেয়েছি আজি রাজ সমাদরে!
ত্যাগের স্বীকার দেখে করিলে আদর।
বিরহীত রেখেছিল সকলের তরে,
লুঠেছিল মোর বাক তরবারি।
যা দিয়ে গড়েছো নিজ বাক তরি,
তরি বেয়ে চলিতেছো সমুদ্রের বারী।
না স্মরণে অড়ি, খুঁজি পাবে কি পাড়ি?
লুন্ঠিত করিলে কুন্ঠিত নয়,
ভূলুণ্ঠিত বুঝিয়ে কলঙ্কিত নয়,
আছে মোর ভুরি ভুরি।
তারি তরে, গর্ব করি,
শোষিত করণে, রসদ রূচিতে,
অলঙ্কৃত ভূষণ করনি ?
প্রদীপ মাহাত
0 Comments