মনে পড়ছে মায়ের ছেঁড়া আঁচল,বৃষ্টি ভেজা সোঁদা মাটির গন্ধ, লাল শালুকের ফুলের আড়ালে বসে থাকা মাছরাঙা, দুপুরের ফেরিওয়ালার ঘুমভাঙানো হাঁক | লিখতে ইচ্ছে করছে পাতা ঝরার শব্দ, ফুল ফোটার শব্দ। চোখে ভাসছে মানভূম-সিংভূমের ধূ-ধূ টাঁড়ের ধুলো ওড়া দুপুর, মাড়-ভাতের স্বপ্নে ডুবে থাকা বিপিএল জীবন। দেখতে ইচ্ছে করছে ঘাসফড়িংয়ের ডানায় শিশিরবিন্দু, শুকনো কাঁদরের দীর্ঘশ্বাস। পড়তে ইচ্ছে করছে বৃষ্টির মেঘ, হুলুধ্বনি, কুলুঙ্গির গান, নাক-বেঁধানোর উল্লাস, কাঁথায় কাঁথায় ছুঁচ-সুতোয় ফুটিয়ে তোলা গরিবের শিল্পকলা। স্বাদ নিতে ইচ্ছে হচ্ছে ভাদরিয়া ঝুমুরের মধুর ,যদিও শহরের পাথরে হা হা অট্ট, চোখের জল, আর ধক ধক করা নিজের হৃদপিণ্ড নিয়ে 'মিনি'র অভিমানের অভিমানের গল্পটা নতুন নয়। এক কবি শ্রদ্ধেয় অভিমন্যু মাহাতো লিখেছেন :
"জ্বরো জ্বরো হিঁয়াক পিঞ্জর
হামে তুমারে চিনিলাম না
ওগো বহি গেলো উমর
আর না বিঁধিঅ ওগো
অচিন নাগর"
সবে বিয়ে হয়েছে তাঁর|বয়স ১৯ | বাবা মা আদর করে নাম রেখেছিলেন মিনি, মিনি মাহাতো| বিয়ের পর এক গ্রাম থেকে উঠে এসে আর গ্রামে বসবাস| জামবনি তে বাপের বাড়ি, শাশুড়বাড়ির গ্রামের নাম কুড়চিবনি | হঠাৎ করে এক নিমেষে পাল্টে গেছে জীবন বৃত্তের পরিচিত মুখ গুলো| এখনো ভালো করে কলেজের গন্ডিও পার হতে পারেনি সে | সমাজের কিছু লোকেরা বলা শুরু করেছিল ফেইসবুক, হোয়াটসআপ এর যুগ, সময়ে মেয়ের বিয়ে না দিলে কলঙ্ক হতে পারে , বদনাম হবে পরিবারের | মা বাবা ভয় পেয়ে তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিয়েছে মিনির| না এ কাবুলিওয়ালার মিনি নয় - জঙ্গলমহলের গ্রীষ্মে পলাশ ফুলে মোড়া মিনিদের সেই গ্রাম এখন চারদিকে শুধুই কাশ ফুলে ঢাকা| বিয়ের পর যতদিনে সবাইকে চিনবে ততদিনে বৃষ্টি বর্ষা শুরু হয়ে গেছিলো, বৃষ্টির প্রার্থনা করে অম্ববতী পালন করেছে তাঁরা, হয়তো প্রার্থনায় খুব একটা ভালোভাবে সাড়া দেয়নি বৃষ্টি দেবতা - প্রকৃতি দেবতা| হ্যাঁ, ওরা প্রকৃতির পুজো করে; ওরা মাহাতো - ছোটনাগপুরের কুড়মি| ওরা মূর্তি পূজাতে বিশ্বাসী নয় |
এক বার পাশের গ্রামে অনুষ্ঠিত এক দাড়িওয়ালা কাকুর মিটিঙে গিয়ে মিনি শুনেছিলো তাঁদের পূর্ব পুরুষদের বঞ্চনার গল্প, সামাজিক বৈষম্যের কথা, না খেতে পেয়ে বিজুবন ছেড়ে ওডিশা, বাংলাদেশ, আসাম চলে যাওয়ার কথা| তখন থেকে মন ভারী ছিল তাঁর| অনেক কষ্ট করে সেদিন বারান্দায় বসে বসে সেই কাকুর নামটা ঠাহর করছিলো মিনি | অবশেষে মনে আসলো সে নাম "অজিত কাকু"|
মিনি অভাগী নয় - পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও সুন্দর মনের মানুষের পরিবারে বিয়ে হয়েছে তাঁর, পড়াশোনা থেমেছে কি না সেটা সময়ই বলবে| বর একটা ছোট্ট সরকারি চাকরি করে | এবছরেই শেষ শ্রাবনের জলে খেতে ধান চাষ শুরু করার সময় নিজে পাঁচ আঁটি করার প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছে মিনির| বিয়ের আগে ক্ষেতের কাদা যে মাড়ায়নি তেমনটি নয় তবুও এবারে পাঁচ আঁটি করতে গিয়ে মিনির পায়ে ধারালো কিছু একটা ফুটে গেছিলো | পায়ে ব্যথা অনুভব হতেই চিৎকার করে পাশে হাল বাইতে থাকা থাকা বরকে ডাকে সে : ওগো শুনছো ? আমার পায়ে রক্ত বেরোচ্ছে |মিনির বর আদর করে ক্ষেতের কাদা থেকে তাঁকে কোলে নিয়ে তুলতে গেছিলো অমনি মিনির শাশুড়ি উপস্থিত হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির মোড় অন্যদিকে ঘুরে গেছিলো, ক্ষেতের কাদায় লটপট সোহাগী অভিমানী সদ্যবিবাহিতা মিনির শাঁখা সিঁদুরের টলমল অবস্থা দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন শাশুড়িমা | বকুনি দিয়েছিলো তাঁকে, বলেছিলো :
"বিয়ে আমার ও হয়েছিল , ঘর সংসার আমিও করেছি; তাবলে ক্ষেতের আইড়ে প্রেম করি নাই কোনো দিন "|
কে বোঝাবে তাঁকে যে মিনির পায়ে পাথর ফুটে গেছিলো | শাশুড়ি তো লোকের মুখে আসল ঘটনা শুনেও বাহানা বলে বলেই বসলেন| যে ভাবেই হোক শাশুড়ি বৌমার টিসা টিসিতে পেরিয়ে গেলো চাষবাস| সেদিন যদি যদি অন্য কেও দেখে নিতো- মিনির মনে অবশ্য পরে এই ভয়টায় জেগেছিলো |
অনেক ইচ্ছে থাকলেও বারী পূজাতে বাপের বাড়ি যাওয়া হয়নি মিনির | মনটা অনেক দিন থেকেই ভারাক্রান্ত| একবার সাহস করে নিজের স্বামীর কাছে আবদার করে বলেই বসলো বাপের বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছের কথা| স্বামী বুঝতে পারলো মিনির মনের ব্যথা| তাঁকে প্রতিজ্ঞা করলো এবারের করম পুজোতে দুজনে মিলে অনেক ভালো ভাবে উদযাপন করবে, সারাদিন মিনির চোখের পাশেই থাকবে, রাতে দুজনে হাথে হাত ধরে নাচবে | স্ত্রীর কাছে করা প্রতিজ্ঞা যাতে পালন করতে পারে তার জন্য অফিসে ছুটির আবেদন করার ইচ্ছে প্রকাশ করলো সে| কিন্তু বিয়ের সময় টানা ২১ দিনের ছুটি উপভোগ করায় ছুটি পাবার কোনো আসায় দেখলো না সে|মনে মনে ফন্দি আঁটলো এবারে করম পরবের দিনকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করিয়েই ছাড়বে সে| কয়েক জন বন্ধু মিলে ঝাড়গ্রাম জেলা শাসক কে একটা দরখাস্ত দিয়ে এলো তাঁরা - উদ্যোগটা অবশ্য মিনির বরেরই বেশি ছিল| সময় ঘনিয়ে আসলো, দিন চলে এলো কিন্তু ছুটি আর ঘোষণা হয়না | খবরের কাগজের শিরোনাম "দফতর-পর্ষদের টানাপোড়েন" নিয়ে| মিনির মনে পড়ে গেলো সেই দাড়িওয়ালা কাকুর কথা, বঞ্চনার ইতিহাস| করম পরবের দিন বুকের মাঝে পাথর বেঁধে অফিস গেলো মিনির স্বামী।ফিরে এলো গোধূলির প্রাকমুহূর্তে| ঘরের মধ্যে ঢুকে মিনিকে এক গাছা কাশ ফুলের ডালি উপহার দিলো মিনির বর| আজ যে তাঁদের পরব - ছোটনাগপুর আদিবাসীদের বৃহত্তম উৎসব করম|
সন্ধেবেলা মিনিদের বাড়িতে করম ডাল গাড়া হলো, হলো পুজোও | বিয়ের পরে প্রথমবার করম করা যায় তাই মিনিও অংশ নিলো তাতে| অভ্যেস না থাকায় কখনো ঘোমটা নিতে ভুলে যাওয়া, কখনো বা জোরে হাসা - শাশুড়ির দৃষ্টি ভঙ্গিতে এরকম ছোটখাটো ভুল সে নাকি করে থাকে বলেই জানে পাড়া প্রতিবেশীরা| রাতে নাচের আসর হলো - ছোট আখড়া, গাঁয়ের কাঁচা কুলহি , ঘরের জানালা থেকে তাকিয়ে মিনি দেখলো অনেক অনেক ভাসুরের সমাগম| যদি নাচতে গিয়ে ছলকে যায়, যদি ভাসুরের গায়ে ছোঁয়া লেগে যায় তাহলে সেই আবার সকালে উঠেই স্নান করতে হবে | কিন্তু ঘরেও যে মন ঠেকেনা তাঁর| এরই মাঝে হঠাৎ করে ঢোল, করতাল, মাদলের মিশ্রনে আখড়ায় সুর বেজে উঠলো:
"ছট মট আখড়া , আর গটা গাঁয়েক ভেসূরা
নাচে গায়ে মকে ছলকে না বনে গো|
কেসন লাগে, মকে করম তিজেক দিনে গো, কেসন লাগে
খায় দায় সাইতা ফেরি সাঁঝে , জায়েক যদি মনেক রিঝে
নাহাই হেতু মকে উঠি বিহানে গো "
মিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, একটু একটু করে এগিয়ে গেলো অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে, মাথার উপরে জোর করে ঘোমটা টেনে নিয়ে নাচরে আসরে নেমে পড়লো সে, মিশে গেলো ভিড়ের মাঝে, নাচলো মন ভরে| নাচের শেষে মিনি অনেকটা হালকা অনুভব করলো| মিনির শাশুড়িও সেদিন বাধা দেয়নি মিনিকে বুঝেছিলো ইটা করম পরব| সবার অধিকার সমান | ফুর্তি করার অধিকার সবারই আছে|
দিন যায়, ক্ষণ যায় সকাল হয় সন্ধে হয় কিন্তু মিনি এখনো ভাবে তাঁদের বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস| নভেম্বর মাসে সবার সাথে সেও দিল্লি যাবে| তাঁর জন্য দিন গুনছে মিনি ও মিনির মতো হাজারো কুড়মি মা বোনেরা| মিনি তুমি সুখে থাকো হাজারো মানুষের আশীর্বাদে|
1 Comments
This comment has been removed by the author.
ReplyDelete