Cultural Virus



রুখা শুখা, উঁচু নীচু, ঢেউ খেলানো, অরন্য পর্বত সমাকীর্ন ছোটনাগপুর মালভুমিতে প্রকৃতির সন্তান, সহজ সরল, অনাবিল,অকপট, পরিশ্রমী সৎ সত্য ভাষী মানুষ গুলি জীবন সংগ্রামের নানান ঘাত প্রতিঘাতে দৈনন্দিন চলার পথের সুখ- দুঃখ, হাসি- কান্না, ব্যথা বেদনার অনুভুতি গুলি প্রতিয়মান হয়ে উঠে; বিভিন্ন উৎসবের সাংস্কৃতিক গানে।
তাই বারো মাসেই অহল্যা সুন্দরীর এই দেশে কান পাতলে শুনা যায়, ধামসা মাদৈর ও নাগড়ার শব্দে। রাশি রাশি শাল পিআল মহুয়া ফুলের গন্ধে চারিদিক আমোদিত করে ভেসে উঠে:--

" বসন্ত সময়ে দ্যুতি, গৃহে নাই মোর প্রজাপতি
নানা ফুল ফুটে মধুমাসে....( শুনঅ)
সখিলো অবলা ধৈরজঅ ধরি কিসে।"

অসংখ্য সাধারন খেটে খাওয়া মানুষ নিত্য নতুন স্বাভাবিক ছন্দে মনের অনুভুতি গুলির বহিঃপ্রকাশ সুরের মূর্ছনায় জনসমক্ষে শ্রুতিমধুর হয়ে আছড়ে পড়ে। তাই সকল সাধারন মানুষ যাঁরা গীতকার ,সুরকার ও গায়ক নিজের সংস্কৃতি, মাটিকে ভালোবাসে , নিঃশর্তে সাধারন মানুষের সমষ্যা ও আনন্দের কথা গানের মাধ্যমে তুলে ধরছেন, সুর দিচ্ছেন এবং লোকায়ত সংস্কৃতিকে প্রানবন্ত ও গতিশীল রেখেছেন। 
এই মানভূম, গানভূম, নাচভূম,ও প্রবাদভূমের মানুষ গুলি কৃষিবর্ষের সঙে সামঞ্জস্য রেখে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক উৎসব, পুজা পার্বন আচার বিচার অনুষ্ঠান করে আসছেন স্বরনাতীত কাল থেকে । নির্দিষ্ট একটা ভৌগলিক পরিমন্ডলের মধ্যে বসবাসকারী এই মানুষ গুলির মধ্যে একটা ভ্রাতৃত্বের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে এই অনুষ্ঠান গুলিকে ঘিরে।
সাম্রাজ্যবাদীদের রাজনৈতিক আয়োজনে আজ সেই বিস্তীর্ন ভূখন্ডের একাংশ বাংলা বিহার ও ওড়িষায়। কিন্তু এখনো ভাষা ও সাংস্কৃতিগত দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে একটা স্বাধীন নিজস্ব স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়।
কিন্তু এই স্বাধীন স্বতন্ত্র সংস্কৃতির গোপন গুহায় ক্ষয়ের দিক চিহ্নগুলি আজ স্পষ্ট প্রতিয়মাম। ভাষা, সাহিত্য ,সংস্কৃতি, কলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে কলকাত্তাইয়া, পাটনা ও ভুবনেশ্বর কেন্দ্রিক তথাকথিত সংস্কৃতিবান, গায়ক,লেখক আবৃতিকার ও গবেষক এর পাল্লায় পড়ে আজ রসাতলের পথে।
মহাশ্বেতা দেবীর ভাষায় এই " Cultural Virus " গুলি নিজেদের স্বার্থকতায় মেতে এই সংস্কৃতির বারোটা বাজাচ্ছেন দিনে দুপুরে। একদা তাঁদের কাছে এগুলি অপসংস্কৃতি মনে হলেও আজ এগুলির "অড়-ফেড়" না জেনেই বিকৃতভাবে বড় বড় গবেষনা পত্র বের করে PhD ডিগ্রি হাসিল করে নামি দামি গবেষক ,সুরকার গীতকার হয়ে এর উপর ছড়ি ঘুরাচ্ছেন। দিনে দুপুরে এই অরন্য সুন্দরীর সুধা পান করার ছলনায় হাতে Camera নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন আদিবাসী মূলনিবাসী গ্রাম গুলিতে ।
কৃষক উচ্ছেদ, জমি হড়প , মহাজনী শোষনের পর এ এক নতুন উপদ্রব। আপনার অগোচরে রেকর্ড যন্ত্রটি চালিয়ে খুব ভাব বিনিময় করে কথা বলবে আর তাঁর উদ্দেশ্য সাধনের মাল মেটেরিআল সংগ্রহ করবে। অথচ তাঁরা সেই রকম কোন বিঙ্গ ব্যক্তির সাথে আলোচনার সদিচ্ছা না দেখিয়েই আপনার কাছ থেকে পাওয়া মৌখিক উপাদানের উপর মারাত্বক সব গবেষনা করে বিশ্ব কাঁপানো তত্ব তুলে ধরেন। উদাহরন হিসাবে বলা যেতে পারে ..... " কালো এবং অপেক্ষাকৃত কুৎসিত দেহাকৃতির জন্য পৌরানিক অভিজাত্য নৃত্যভিনয়ে অংশ নেওয়ার সময় পুরুল্যার জনসমাজ মুখোশ ব্যবহার করে।"...." বাঁদনা পরবের একটি প্রধান অঙ্গ হল গরু মহিষকে একটি শক্ত খুঁটিতে বেঁধে লাঠি দিয়ে খোঁচা মেরে মেরে ক্ষিপ্ত করে নাচানো। 
পূর্বে হত্যা করা হলেও বর্তমানে খোঁচা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।....ভাদু পূজার জাগরণ কালের সমবেত নর-নারীর অবাধে মেলামেশা করে।......ছোটনাগপুর এর কুড়মি জাতি আর্য গোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত। দীর্ঘকাল বিচ্ছিন্ন ভাবে বসবাস করায় তাদের "রহন-সহন" এ উত্তর ভারতের কর্মীদের থেকে কিছু পরিবর্তন আসে।....
ছো এর পরিবর্তে ছৌ ।এরকম হাজারো উদাহরণ খুঁজলে পাওয়া যাবে। এবং আরেকটি লক্ষণীয় দিক হল তাঁদের গবেষণায় উল্লেখিত সংগ্রহ গীত গুলি শতকরা 90 শতাংশের বানাান ভুুল।
এই ভাইরাসগুলো গ্রাম্য জনজীবনের মনের ভাব ভাষা চাহিদা না বুঝেই তাঁদের পরম্পরাগত মূল্যবোধকে আঘাত করে থাকেন। যার প্রকৃষ্ট উদাহারণ জনৈক চক্রবর্তীর লেখা "মদনা ছোড়া ধামসা বাজাইছে" ।এরকম অনেক বাবু মিঞা না জেনে না বুঝে ছোটনাগপুরের চিরাচরিত সংগীত টুসু, করম, ঝুমৈর বাঁদনা প্রভৃতির গানের নাম করা আকাশবানী Approved শিল্পী। 
গায়কী ঢং, উচ্চারণ ভঙ্গি তথা বিষয়বস্তুর গভীরে না গিয়েই শহরকেন্দ্রিক মানুষের কাছে তার বিকৃতি উপস্থাপন করে এক দিনে গানের স্বতন্ত্রতার বারোটা বাজাচ্ছে  অপরদিকে দেদার মুনাফা লুটছে।অথচ এরাই বিভিন্ন সময়ে এই ভাষাকে ও মানুষগুলিকে ব্যঙ্গ করতে দ্বিধাবোধ করে না।এরা সেই সকল গ্রামীণ শিল্পী কে উপেক্ষা করে 50 টি গ্রামীণ শব্দ জেনে মাটির কাছাকাছি যাবার অভিনয় করে। যাঁদের ঝুমৈর এর সঙ্গে রক্তের টান তারা বুঝতেই পারে না এগুলি ঝুমৈর না অন্য কিছু!
একবার পুরুলিয়ার এক শিল্পীকে তানপুরা ও গিটার নিয়ে ঝুমৈর করতে বললে তিনি

রাগে বলেছিলেন পুরুলিয়া কি পশ্চিমবঙ্গের বাইরে! যে আকাশবাণীতে মাদল স্থান পায় না? তারা ঘাবড়ে গিয়ে বলেছিলেন এরপর রাখা হবে। কিন্তু রাখলেও বাজাবে কে, শিল্পীকে তো পুরুলিয়া থেকে আনতে হবে যা তাদের মনঃপুত হয়নি।
কলকাতা শহর কেন্দ্রিক মানুষ এই সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে অপরিচয়ের দূরত্বে থাকার জন্য এই ভাইরাসগুলোকে আসল ধারক ও বাহক ভাবে। আমার মনে হয় তাঁরা এখনো ঝুমৈর এর " ঝ" জানে না।
তাঁদের উচ্চারণগত ত্রুটির  পরীক্ষার জন্য আমি কলকাতা কেন্দ্রিক কিছু শিল্পীর গাওয়া গান আমাদের গ্রামের কয়েকজনকে শুনিয়েছিলাম। শেষে বললাম ঝুমৈর গানটি দারুন গেয়েছে। তারা বলল এটা ঝুমৈর আমরা ভাবলাম রবীন্দ্র সংগীত।এখানের মানুষ বুঝতেই পারছে না কোনটা ঝুমৈর আর কোনটা রবীন্দ্র রবীন্দ্রসঙ্গীত।এ প্রসঙ্গে একটি সুন্দর কথা কোন এক ঝারখন্ড পার্টির মিটিং এ মাননীয় অজিত মাহাতো বলেছিলেন " কলকাতার বাবুরা বইয়ে লিখে দিলো , যে নদী কুলুকুলু ধ্বনীতে বয়ে যায়। তাঁরা তাঁদের পিঁদাড় কলের সমভুমির নদীটা দেখেছে কুলুকুলু। আর হামদের নুনী যখন বইয়ে পড়ছে নদী কুুলুকুলু বহে তখন সে তাঁর বাপকে বলছে, হে বাপ হামদের মারাং গাঢ়াটা যে হদহদায় গদগদায় বহে, তখন উয়ার বাপে বলছে ঊ ব্যাটারা কোন হামদের মারাং গাঢ়াটা দেখেছে যে ওমন লিখব্যেক! ডাইরি খালের রকম হরপা বানে বহায় যাবেক তখন বুঝবেক। "

এই সাম্রাজ্যবাদী ভাইরাসদের অনুপ্রবেশ থেকে ঝাড়খন্ডী সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে না পারলে তার স্বতন্ত্রতা বলে কিছু থাকবে না।


রাজেশ মাহাতো
বাগমুন্ডি পুরুল্যা

0 Comments