সৃষ্টির আদিকাল থেকেই মানুষ জীব জন্তুদের পোষ মানাবার চেষ্টা করে এসেছে। আর সেই চেষ্টায় প্রথম সফল হয়েছিল কুকুরকে পোষ মানাতে। সে শিকারে সহযোগিতা করতো। পরে মানুষ চাষবাসের পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে গরু মহিষদের পোষ মানাবার চেষ্টা করলো আর সফলও হলো। গরু মহিষ কৃষি কাজে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করলো। চাষবাসে সফল হয়ে মানুষের আনন্দের সীমা রইলো না। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল বাঁদনা বা সঁহরই পরবের মধ্যে দিয়ে। তা বলে মানুষ অতটা নিষ্ঠুর নয়। যাদের সাহায্যে তারা কৃষি কাজে সফলতা পেল তাদেরও যথা যোগ্য সম্মান জানাতে পিছুপা হয় নি। সেই ধারা এখনো বর্তমান আছে রাঢ় অঞ্চলে অর্থাৎ একফসলী জমিতে বসবাসকারী সাঁওতাল মাঝি মুণ্ডা কুড়মি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে।
প্রতিটি সংস্কার কুসংস্কারের পিছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তি থাকে। তবে কি বাঁদনা সেঁহরেই পরবের রীতি নীতিগুলিতেও আছে?
অবশ্যই কয়েকটা রীতি নীতি উল্লেখ করলেই তা বুঝতে পারবেন। তবে একাজে যারা প্রত্যক্ষ অনুভবি তারাই সেটাকে বুঝে উঠতে পারবেন।
উৎসব শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে থেকেই চাষিরা তাদের ঘরে উঠোনে খামারে নতুন মাটি লেপন করে বিভিন্ন রঙিন মাটির সাহায্যে ঘরকে রাঙিয়ে তুলে। বুঝতে অসুবিধা থাকার কথাই নয় যে বৃষ্টিতে জীর্ণ ঘরদোর মেরামত করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা। এবার চাষের কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী পরিষ্কার করা কারণ আবার চাষের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। গরু মহিষদের ধুয়ে পরিষ্কার করা অর্থাৎ জীবনু মুক্ত করা।শিং এ তেল দিয়ে শিং এর জীবানু মুক্ত ও সবল করা। গোয়াল ঘরে সারারাত্রি প্রদীপ জ্বালানোর পিছনে বিশেষ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে তা হলো গরু মহিষদের আলোর সাথে পরিচয় করানো। গরুর গাড়িতে যখন ধান আনা হয় অনেক সময় রাত্রি হয়ে যায়। সেই অন্ধকার রাত্রিতে গাড়ি বয়ে আনা কতটা দুঃসাধ্য তা একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া বোঝার উপায় নেই। সেই সময় এই রাত্রি জাগরণের মাটির প্রদীপের আলোটাই কাজে লাগে। যতই রাত হোক গরু আগে একটা হ্যারিকেন নিয়ে এগোতে থাকলে মাহুর গরু সুন্দর গাড়ি টেনে খামারে উপস্থিত করে দেয়।
এবার বাঁদনা/ সেঁহরেই পরবের মূখ্য উৎসব গরুখুঁটা বা বরদ ভিড়কা। এটিও বৈজ্ঞানিক যুক্তি মেনেই করা হয়েছে। সেই যে শ্রাবণ মাসে ধান লাগাবার কাজ শেষ হয়েছে তারপর গরু মহিষদের দিয়ে আর কোন কাজ করা হয় নি। তাদের শরীরে আড়ষ্টতা এসেছে। এর পর ক্ষেত থেকে গাড়িতে করে ধান আনতে হবে। হটাৎ কাজ করলে পরের দিন শরীরে ব্যথা করা স্বাভাবিক।গরু মহিষও এর ব্যতিক্রম নয়। তখন তারা গাড়ি জুড়া অবস্থাই বসে পড়ে। মারলেও সাড়া করে না আর তা অভ্যাসে পরিনত হয়। আমরা বলি গরুটা কুড়হি (অলস) হয়ে গেল। তাই তাদের আড়ষ্টতা কাটাবার জন্য বরদ ভিড়কা বা গরুখুঁটা করা হয়। তাতে তাদের শরীরকে কসরত করার জন্য করা হয় এতে তাদের আড়ষ্টতা কাটে। কিন্তু বাজনার প্রয়োজন কি? আছে, খালি গরুগাড়িতে প্রচুর আওয়াজ করে। সেই আওয়াজে অভ্যস্ত না হলে সেই সকল গরু মহিষরা গাড়ির আওয়াজে দিক্বিদিক দৌড়াতে থাকে।শেষে জুঁয়াল গাড়ি ভেঙে রাখে দেয়। সেই কারনেই বাজনা সহকারে তাদের কসরত করার দরকার পড়ে। তাতে আড়ষ্টতা যেমন কাটে বাজনার আওয়াজটাকে অনুভব করে গাড়ির আওয়াজটাকে আর তোয়াক্কা করে না। বিশেষ করে দেখা যায় সেই সকল গরু মহিষদের ভিড়কানো হয় যে সকল গরু মহিষরা কোন আওয়াজে চমকে উঠে।
বর্তমানেও গ্রামাঞ্চলে যেহেতু গরুর গাড়ির ব্যবহার হয় তাই এই রীতি নীতিগুলির প্রয়োজন আছে বৈকি। যেখানে মাঠের সোনালী ধান ঘরে নিয়ে আসার আগে আনন্দ উৎসবে মাতবে চাষের কাজে সাহায্যকারীদের শ্রদ্ধা জানাবে তা কোন মতেই বিজ্ঞান বিরোধী হতে পারে না।
0 Comments