RAJESH MAHATO
=========* সারহুল*=======
রাজেশ মাহাতো, বাগমুন্ডি, পুরুল্যা।
রুখা, শুখা উঁচু-নিচু ঢেউ খেলানো অরণ্য পর্বত সমাকীর্ণ ছোটনাগপুর জঙ্গলে প্রকৃতির সবুজ মূর্ছনায় শিমুল পলাশ এর রক্তিম আভা ও কোকিলের কুহুতানে, এক রোমাঞ্চক লোমহর্ষক উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় মনে প্রানে। বনে বনে বহুবিচিত্র অরণ্য পুষ্পের সমারোহে চারদিক যখন বর্নবহ্নি জ্বলে ওঠে, রাশি রাশি শাল মহুয়া ফুলের গন্ধে আকাশ বাতাসকে আমোদিত করে, তখনই অনুষ্ঠিত হয় মহাপর্ব সারহুল। প্রকৃতিকে নতুন সাজে নতুন রূপে বরণ করা হলো সারহুল। শাল গাছের পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সারুল। চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের আমাবস্যার দ্বিতীয় তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামবাসীরা সকলে তার না ফলে বিভিন্ন রকম নয় বিদ্যা অর্জন করে গ্রামবাসী তথা সমস্ত জীবনের সুখ-শান্তি সমৃদ্ধি, সবুজায়নের দীর্ঘস্থায়ী ও চাষবাস যাতে ভালো হয় তার প্রার্থনা করে।
বিভিন্ন রকমের ফুল,ফল মূল প্রথমে ধরতি মাতা কে নৈবদ্য দিয়ে তারপর তাঁরা সেটাকে প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করে। পূজা শেষে একে অপরকে সারহুল জোহার জানিয়ে ঢোল মাদৈলের তালে সারহুল শোভাযাত্রায় সামিল হয় সকলে। সারহুল সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতি মায়ের পূজা, প্রেম ও ভ্রাতৃত্বের পরব। পৃথিবীর কোনায় কোনায় আদিবাসীরা নিজেদের স্বাভিমান স্বতন্ত্র তাকে আগলে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে জানে। তারা সরল শান্ত অকপট, নির্ভীক তার প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় পাতায় বর্তমান। আর এই সরলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের নামে, ছলে বলে কৌশলে তাদের জমি দখল করে ভূমিহীন শ্রমিক এ পরিণত করছে বিভিন্ন কোটিপতি, শিল্পপতি, সরকারের নগ্ন অগ্রাসী় পলিসি।
আত্মনির্ভরশীল শ্রদ্ধাশীল সম্প্রদায় থেকে আজ ভূমিহীন শ্রমিক ও গৃহকর্মী রুপে শহরগুলিতে ছড়িয়ে পড়ছেন তাঁরা। আজকের বিশ্বায়নের যুগে আদিবাসীদের এই সারহুল পরবে সবুজের বন্দনা তথা কামনা নিঃসন্দেহে এক অনন্য তাৎপর্য বহন করে। সারহুল ( শাল ফুল) এর মাধ্যমে প্রকৃতির নবরূপ কে স্বাগতম জানাই। আদিবাসীদের জীবনধারা প্রকৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এঁদের আচার-বিচার, নেগ নেগাচার পরব তিহার ঋতুচক্রের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অন্যান্য দেশের আদিবাসীদের মতোই ভারতের আদিবাসীরা প্রকৃতির উপাসক, প্রকৃতির প্রতিটা জীব জড়ের মধ্যে জীবন শক্তির মৌলিক উর্জা খোঁজেন। বৃক্ষ, নদী, পাহাড়, পাথর পশু প্রভৃতি আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনকে প্রভাবিত করে, এইজন্য আদিবাসীরা বিশ্বাস করে যে সুস্থ জীবন, ভালো ফসল ,এবং উর্বর পশু পালনের জন্য একটি সুম্পর্কের প্রয়োজন। প্রতিটা জীব ধরতি মাতা থেকে আসে এবং মৃত্যুর পর সেথাই ফিরে যায় ফলে একটা ভারসাম্য বজায় থাকে। আদিবাসীরা পরিবেশের সবচেয়ে বেশী ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে তার সংরক্ষণ করে আসছেন তাদের বিভিন্ন পরব পার্বন গুলির মধ্য দিয়ে। যেখানেই পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে, সেখানে আদিবাসীরা বিরোধী করেছে। ভারত জীব-বৈচিত্র্যে , বাস্তুতন্ত্রে এক অতি উন্নত দেশ এবং তার সিংহ ভাগ সংরক্ষণ ও লালন-পালন এর দাবিদার আদিবাসীরা। কিন্তু বর্তমানে ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও নগরায়নের যুগে আজ জীব বৈচিত্র// বাস্তু তন্ত্রের সঙ্গে আদিবাসীদের জীবনও এক উদ্বেকজনক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে .....
আদিবাসীদের প্রতিটা পরব তিহার এর ভেতর একটা না একটা লোককথা লুকিয়ে থাকে..... তেমনি সারহুল পরবের কেহনি টা হলো এই রকম...।সূর্য এবং ধরতি মাতার একমাত্র কন্যার মৃত্যুলোক ফিরে আসার নাম সারহুল । বিঁন্দি স্নান করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যাই। পৃথিবী কন্যা সন্তান হারানোর দুঃখে ধীরে ধীরে বিমর্ষ হয়ে পড়লে, গাছপালা লতাপাতা জীবজন্তু সব মূর্ছিত হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বিঁন্দির খবর পাওয়া গেল পাতাল রাজার কাছে।পৃথিবীর সমস্ত জীবকূল পাতাল রাজাকে অনুরোধ করে বিঁন্দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কিন্তু তিনি এই শর্তে রাজি হয় যে বছরের একটা সময় তাঁকে পাতালপুরে আসতে হবে। অতঃপর বিঁন্দির পৃথিবী কোলে আগমনে পৃথিবী আবার চারদিকে ফুলে ফুলে সুসজ্জিত হয়ে উঠে। এই উৎসবে হাজার হাজার মানুষ বন্দনায় মেতে উঠে। ভেদ-ভাব দুঃখ-গ্লানি বেদনা সবকিছু ভুলে কাতারে কাতারে মানুষ ঢোল মাদলের সুরে নিজেকে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত করে।বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। বেঁচে থাকার জন্য যেমন বিশুদ্ধ বায়ুর প্রয়োজন, তেমনি শাল গাছ থেকে বিভিন্ন ভেষজ জিনিস পাওয়া যায়। বর্তমান শহরকেন্দ্রিক শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী যদি সারহুল এর রহস্য সম্পর্কে এখনো জেগে ঘুমায় তাহলে আর সেই দিন বেশি দূরে নয় যখন সবাইকে এক ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হবে। সারহুল তাঁর আগমনের নিমন্ত্রণ বিভিন্ন ভাবে জানান দেয়। গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ে দুর দুরান্তে উড়ে গিয়ে সকলের আমন্ত্রণ দেয়। বোনের মধ্যে এক রিক্ততা গা ছমছম ভাব ঠিক তখনই সারই ফুল ফুটে, আকাশ বাতাসে তার সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ডালে ডালে লাল গোলাপি পল্লব চমকে উঠে। পরে হয়ে চৈত্রের আকাশকে ঝিলিক মেরে জানান দেয় সারহুল এসে গেছে। সারই ফুলের সুবাস নিয়ে ভোমর সারহুল গীত গেয়ে বেড়ায়। এর সীমাবদ্ধতা এখানে নয় ... ইতিহাসের পাতায় পাতায় এর অস্তিত্ব বিরাজমান।
=================================
=========* সারহুল*=======
রাজেশ মাহাতো, বাগমুন্ডি, পুরুল্যা।
রুখা, শুখা উঁচু-নিচু ঢেউ খেলানো অরণ্য পর্বত সমাকীর্ণ ছোটনাগপুর জঙ্গলে প্রকৃতির সবুজ মূর্ছনায় শিমুল পলাশ এর রক্তিম আভা ও কোকিলের কুহুতানে, এক রোমাঞ্চক লোমহর্ষক উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় মনে প্রানে। বনে বনে বহুবিচিত্র অরণ্য পুষ্পের সমারোহে চারদিক যখন বর্নবহ্নি জ্বলে ওঠে, রাশি রাশি শাল মহুয়া ফুলের গন্ধে আকাশ বাতাসকে আমোদিত করে, তখনই অনুষ্ঠিত হয় মহাপর্ব সারহুল। প্রকৃতিকে নতুন সাজে নতুন রূপে বরণ করা হলো সারহুল। শাল গাছের পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সারুল। চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের আমাবস্যার দ্বিতীয় তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামবাসীরা সকলে তার না ফলে বিভিন্ন রকম নয় বিদ্যা অর্জন করে গ্রামবাসী তথা সমস্ত জীবনের সুখ-শান্তি সমৃদ্ধি, সবুজায়নের দীর্ঘস্থায়ী ও চাষবাস যাতে ভালো হয় তার প্রার্থনা করে।
বিভিন্ন রকমের ফুল,ফল মূল প্রথমে ধরতি মাতা কে নৈবদ্য দিয়ে তারপর তাঁরা সেটাকে প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করে। পূজা শেষে একে অপরকে সারহুল জোহার জানিয়ে ঢোল মাদৈলের তালে সারহুল শোভাযাত্রায় সামিল হয় সকলে। সারহুল সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতি মায়ের পূজা, প্রেম ও ভ্রাতৃত্বের পরব। পৃথিবীর কোনায় কোনায় আদিবাসীরা নিজেদের স্বাভিমান স্বতন্ত্র তাকে আগলে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে জানে। তারা সরল শান্ত অকপট, নির্ভীক তার প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় পাতায় বর্তমান। আর এই সরলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের নামে, ছলে বলে কৌশলে তাদের জমি দখল করে ভূমিহীন শ্রমিক এ পরিণত করছে বিভিন্ন কোটিপতি, শিল্পপতি, সরকারের নগ্ন অগ্রাসী় পলিসি।
আত্মনির্ভরশীল শ্রদ্ধাশীল সম্প্রদায় থেকে আজ ভূমিহীন শ্রমিক ও গৃহকর্মী রুপে শহরগুলিতে ছড়িয়ে পড়ছেন তাঁরা। আজকের বিশ্বায়নের যুগে আদিবাসীদের এই সারহুল পরবে সবুজের বন্দনা তথা কামনা নিঃসন্দেহে এক অনন্য তাৎপর্য বহন করে। সারহুল ( শাল ফুল) এর মাধ্যমে প্রকৃতির নবরূপ কে স্বাগতম জানাই। আদিবাসীদের জীবনধারা প্রকৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এঁদের আচার-বিচার, নেগ নেগাচার পরব তিহার ঋতুচক্রের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অন্যান্য দেশের আদিবাসীদের মতোই ভারতের আদিবাসীরা প্রকৃতির উপাসক, প্রকৃতির প্রতিটা জীব জড়ের মধ্যে জীবন শক্তির মৌলিক উর্জা খোঁজেন। বৃক্ষ, নদী, পাহাড়, পাথর পশু প্রভৃতি আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনকে প্রভাবিত করে, এইজন্য আদিবাসীরা বিশ্বাস করে যে সুস্থ জীবন, ভালো ফসল ,এবং উর্বর পশু পালনের জন্য একটি সুম্পর্কের প্রয়োজন। প্রতিটা জীব ধরতি মাতা থেকে আসে এবং মৃত্যুর পর সেথাই ফিরে যায় ফলে একটা ভারসাম্য বজায় থাকে। আদিবাসীরা পরিবেশের সবচেয়ে বেশী ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে তার সংরক্ষণ করে আসছেন তাদের বিভিন্ন পরব পার্বন গুলির মধ্য দিয়ে। যেখানেই পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে, সেখানে আদিবাসীরা বিরোধী করেছে। ভারত জীব-বৈচিত্র্যে , বাস্তুতন্ত্রে এক অতি উন্নত দেশ এবং তার সিংহ ভাগ সংরক্ষণ ও লালন-পালন এর দাবিদার আদিবাসীরা। কিন্তু বর্তমানে ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও নগরায়নের যুগে আজ জীব বৈচিত্র// বাস্তু তন্ত্রের সঙ্গে আদিবাসীদের জীবনও এক উদ্বেকজনক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে .....
আদিবাসীদের প্রতিটা পরব তিহার এর ভেতর একটা না একটা লোককথা লুকিয়ে থাকে..... তেমনি সারহুল পরবের কেহনি টা হলো এই রকম...।সূর্য এবং ধরতি মাতার একমাত্র কন্যার মৃত্যুলোক ফিরে আসার নাম সারহুল । বিঁন্দি স্নান করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যাই। পৃথিবী কন্যা সন্তান হারানোর দুঃখে ধীরে ধীরে বিমর্ষ হয়ে পড়লে, গাছপালা লতাপাতা জীবজন্তু সব মূর্ছিত হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বিঁন্দির খবর পাওয়া গেল পাতাল রাজার কাছে।পৃথিবীর সমস্ত জীবকূল পাতাল রাজাকে অনুরোধ করে বিঁন্দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কিন্তু তিনি এই শর্তে রাজি হয় যে বছরের একটা সময় তাঁকে পাতালপুরে আসতে হবে। অতঃপর বিঁন্দির পৃথিবী কোলে আগমনে পৃথিবী আবার চারদিকে ফুলে ফুলে সুসজ্জিত হয়ে উঠে। এই উৎসবে হাজার হাজার মানুষ বন্দনায় মেতে উঠে। ভেদ-ভাব দুঃখ-গ্লানি বেদনা সবকিছু ভুলে কাতারে কাতারে মানুষ ঢোল মাদলের সুরে নিজেকে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত করে।বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। বেঁচে থাকার জন্য যেমন বিশুদ্ধ বায়ুর প্রয়োজন, তেমনি শাল গাছ থেকে বিভিন্ন ভেষজ জিনিস পাওয়া যায়। বর্তমান শহরকেন্দ্রিক শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী যদি সারহুল এর রহস্য সম্পর্কে এখনো জেগে ঘুমায় তাহলে আর সেই দিন বেশি দূরে নয় যখন সবাইকে এক ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হবে। সারহুল তাঁর আগমনের নিমন্ত্রণ বিভিন্ন ভাবে জানান দেয়। গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ে দুর দুরান্তে উড়ে গিয়ে সকলের আমন্ত্রণ দেয়। বোনের মধ্যে এক রিক্ততা গা ছমছম ভাব ঠিক তখনই সারই ফুল ফুটে, আকাশ বাতাসে তার সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ডালে ডালে লাল গোলাপি পল্লব চমকে উঠে। পরে হয়ে চৈত্রের আকাশকে ঝিলিক মেরে জানান দেয় সারহুল এসে গেছে। সারই ফুলের সুবাস নিয়ে ভোমর সারহুল গীত গেয়ে বেড়ায়। এর সীমাবদ্ধতা এখানে নয় ... ইতিহাসের পাতায় পাতায় এর অস্তিত্ব বিরাজমান।
=================================




0 Comments