রইহন

কুড়মালি ভাষার রহা শব্দ থেকে রহিন শব্দের উৎপত্তি। রহা মানে থাকা। এরপর দেখতে হবে যে কি রহা? কোথায় রহা? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখতে হবে, তবেই এই কথাটির অন্তর্নিহিত অর্থ পাওয়া যাবে। সকলেই জানেন যে এই কুড়মি জাতির প্রধান জীবিকা হল কৃষি। আজও এরা কৃষি নির্ভরশীল এবং কৃষি হল এদের সবকিছু। এই জন্য এদের সমস্ত পরব পার্বণ পূজা পাশা দেবদেবী ইত্যাদি সমস্ত কৃষির উপর আধারিত। এই রহিন হলো একটি কৃষি ভিত্তিক অনুষ্ঠান। পৃথিবীর সকল ধর্মেই এই পৃথিবী কে মাতৃরূপে দেখে থাকে । কোন ধর্মেই একে পুরুষ রূপে দেখা হয় না। মায়ের গর্ভে যেমন শিশুর অবস্থান, সেই রূপ, পৃথিবীর গর্ভে সমস্ত জীব জন্তু পশু পাখি গাছপালা লতাগুল্ম সবারই অবস্থান, তাই পৃথিবীকে মাতৃরূপে দেখা হয়। এই রহিন দিন কৃষকগণ বছরের প্রথম পৃথিবীতে অর্থাৎ খেতে বীজ বুনে এবং পৃথিবীর গর্ভে বছরের প্রথম বীজ রাখা হয় বলে এর নাম রহিন। জ্যৈষ্ঠ মাসে 13 দিনে হয় রহিন, কিন্তু ওই একদিনই রহিন শেষ হয় না। রহিন সাত দিন থাকে। আর ওই রহিন 7 দিনের মধ্যেই এ অঞ্চলের চাষীরা বীজতলার কাজ শেষ করতো। রহিন দিন ভোরের সময় মা-বোনেরা কোন ক্ষেত থেকে রহিন মাটি নিয়ে আসে এবং সূর্যোদয়ের আগেই ঘরের প্রতিটি দেওয়ালে রেখা টেনে দেয় গোবর দিয়ে। লোকের বিশ্বাস ওই রেখা কোন বিষধর সাপ অতিক্রম করতে পারবে না। এটা হল সাপ এর পক্ষে লক্ষণরেখা। ঐদিন বাড়িতে শাহড়া ডাল গুঁজে দেওয়া হয়, কারণ লোকের বিশ্বাস আছে ওই শাহড়া ডাল বজ্র নিবারক্। রহিন দিন সমস্ত বিষধর সাপ গর্ত থেকে বের হয়। সেই জন্য বিষ প্রতিরোধক হিসাবে ঐদিন আসাড়ী ফল খাওয়ার প্রচলন ছিল এবং আজও আছে। ধরিত্রী মায়ের ওই দিন হাঁস বা পায়রা বলি দিয়ে পূজা করা হয় ও রাত্রে খাপইর় পিঠা খাওয়ার প্রচলন আজও কোথাও কোথাও বর্তমান। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা গ্রামের প্রতি ঘরে রহিন নাচ গান করে। পরিবারের লোক তারাকে চাল পয়সা দেই এবং ছেলের আনন্দে মেতে উঠে।  ( সিন্ধু থেকে সুবর্ণরেখা// কুড়মি জাতির ইতিহাস //জ্যোতি লাল মাহাতো)

0 Comments