জঙ্গলমহলে জৈন ধর্মের বিস্তার ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল, তা অনুমান নির্ভর। তবে পশ্চিম রাঢ়ে শৈব ধর্মের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল আনুমানিক সাত হাজার বছর পূর্বে। সেই সুত্রে জৈন প্রভাব আড়াই হাজার বছর পূর্বে বলেই পন্ডিতদের অনুমান।
জৈন ধর্মের প্রসার যখন তুঙ্গে, সেসময় কাঁসাই নদীতে রীতিমত নৌ-বাণিজ্য চলত। কাঁসাই-এর দুই তীরে এবং সংলগ্ন অন্চলের গ্রামগুলিতে অসংখ্য জৈন কেন্দ্র গুলি দেখে নিশ্চিত বোঝা যায় কাঁসাই নদীর জলপথকেই জৈন ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করত। নদী পথে বিশ্রাম বা মাল ওঠানামার জন্য যে ঘাটগুলি তারা ব্যবহার করত সেখানেই তারা তাদের ধর্মীয় উপাসনা কেন্দ্রগুলি গড়ে তুলেছিল। পরে ধীরে ধীরে তারা ভেতরের গ্রামগুলিতেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়েছিল।
সাবেক বিনপুর থানার এরকম একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র ছিল লা-ঘাটা। গ্রাম নামেই এর পরিচয়। লা-অর্থে নৌকা, ঘাটা অর্থে ঘাট। অর্থাৎ, নৌকাঘাট। মানভূমের দেউলঘাটা থেকে জলপথে এই লা-ঘাটায় এসে জৈন ব্যবসায়ীরা বিশ্রাম নিত এবং স্থানীয়ভাবে যে তামা সংগৃহীত হত, তা স্বল্পমূল্যে কিনে জিনসর হয়ে তাম্রলিপ্ত বন্দরে চালান দিত। ওখান থেকে জাহাজ যোগে দেশে বিদেশে রপ্তানী হয়ে যেত। এই জৈন ব্যবসায়ীদের অর্থানুকুল্যেই লা-ঘাটা কেন্দ্রীক জৈন কেন্দ্রগুলি সেসময় গড়ে উঠেছিল লা-ঘাটা, ডাইনটিকরী, নচিপুর, বলরামপুর, নেপুরা, ওড়গঁদা, রাজপাড়া, মুড়ারী ইত্যাদি গ্রামগুলিতে।
জৈনদের তামার ব্যবসা ছিল প্রধান। এজন্য তামার আকরিক উৎসের সুত্রে এখানে আস্ত একটি পাহাড়ের নামই হয়ে গেছে তামলি মাঞ। এছাড়া তামাজুড়ি, তামাখুন, তামাকুড় গ্রামনামগুলিও তামার উৎসের সাক্ষ্য বহন করছে।
লা-ঘাটা গ্রামের জৈন কেন্দ্রটি আজ কাঁসাই-এর দহতে লীন। তবে ডাইনটিকরীর জৈন কেন্দ্রটির অস্তিত্ব বর্তমান। নচিপুর গ্রামের পাশে চমৎকার শিল্প সুষমায় মোড়া তীর্থঙ্কর জৈনের মূর্তিটি চোখ চেয়ে দেখার মত। নেপুরা, বলরামপুর, ওড়গঁদায় রয়েছে শুধু ধংসাবশেষ।
রাজপাড়া এবং মুড়ারী গ্রামের জাহের থান দখল করে একসময় যে জৈনরা জৈন কেন্দ্র গড়ার চেষ্টা করেছিল, তার স্পস্ট প্রমাণ আছে। দুটি ক্ষেত্রেই খেরোয়াল আদিবাসীরা জাহের থান অশুদ্ধ বিচারে অন্যত্র সরিয়ে নেয় তাদের জাহের থান।
রাজপাড়ায় প্রাচীন জাহের থানের জায়গায় পোড়ামাটির হাতি ঘোড়ার সঙ্গে এখন রয়েছে একটি পাথরের মূর্তি। মূর্তিটির মাথায় রয়েছে সপ্ত মুন্ড সাপ। মুখ এবং বুক ছেনি দিয়ে বিকৃত করা। নগ্ন মূর্তিটির নিম্ন অংশে পুরুষাঙ্গের চিহ্ন। নিম্ন দুই বাহু। পাঁচটি আলাদা ছোট মূর্তি দুপাশে। মাথায় সাপের উপস্থিতি বলে, এটি পার্শনাথ জৈনের মূর্তি। তবে জৈনদের সর্পদেবতার মূর্তিও প্রায় একইরকম। সবর সম্প্রদায়ের একজন রাজপাড়ার এই থানে প্রথম পূজা করার পর নতুন জাহের থানে পূজা দেন। পূজা এখানে হয় প্রতিবছরই ১লা মাঘ।
স্থানীয়দের এই মূর্তি সম্পর্কে বিশ্বাস হল, মূর্তিটি লোকেশ্বর বিষ্ণুর।
অন্যদিকে, মুড়ারী গ্রামের প্রাচীন জাহের থানটি ছিল জাহের ডাঙ্গায়। জাহের থানের নামেই স্থান নাম। এখানে এখন পূজা হয় না। পরিত্যক্ত থানটিতে এখন পড়ে আছে জৈন কেন্দ্রের প্রচুর জ্যামিতিক আকার বিশিষ্ট পাথর। গ্রামের জাহের থান অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানেই পূজা হয়। তবে এর কিছু দুরে বরকইনার ডাঙ্গা নামে একটি স্থানে বেশ কিছু ভগ্ন মূর্তি ও মন্দিরের অংশ পড়ে আছে। এই স্থান থেকে প্রায় তিন কিমি দুরে একটি গ্রামের বর্তমান নাম জয়নগর। স্থানীয় উচ্চারণে জৈনঘর। এই জৈন ঘর--জইনঘর---জয়নগরে রূপান্তরিত আজ।
জঙ্গলমহলে জৈনদের পুরাকীর্তিগলির সংরক্ষন জরুরী। ইতিহাস জানতে এবং পর্যটক আকর্ষনে নতুন দ্রষ্টব্য হতে পারে জৈনদের কীর্তিগুলি।
বি:দ্র: মূর্তির ছবি রাজপাড়া গ্রামের। ষাঁড় এবং চক্রের ছবি ওড়গঁদা গ্রামের।



0 Comments